ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর মোটেও খুশি নন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই যুদ্ধ থামাতে রুশ প্রেসিডেন্টকে ৫০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন তিনি। হুঁশিয়ারি দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, এই সময়ের মধ্যে যুদ্ধ না থামলে মস্কোর ওপর বিশাল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেবেন। জবাবে সাবেক রুশ প্রেসিডেন্ট বলেছেন, এই হুমকি ‘নাটুকে’।
পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর প্রধান মার্ক রুত্তের সঙ্গে গতকাল সোমবার হোয়াইট হাউসে বৈঠক করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, যুদ্ধ থামানোর আহ্বান জানানোর পরও পুতিন তাতে কান দিচ্ছেন না। এতে তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। পুতিনের ওপর তিনি ‘খুবই ক্ষুব্ধ’। ৫০ দিনের মধ্যে যুদ্ধবিরতির একটি চুক্তি না হলে তিনি মস্কোর ওপর বিশাল শুল্ক আরোপ করবেন। তা প্রায় ১০০ শতাংশ হতে পারে।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর মস্কোর ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশ। এতে ব্যাপক চাপে পড়ে রুশ অর্থনীতি। সোমবারের বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ‘দ্বিতীয় ধাপে’ তিনি যে শুল্কের কথা বলছেন, তা রাশিয়ার বাকি বাণিজ্য অংশীদারদের লক্ষ্য করে আরোপ করা হতে পারে। গত বছর রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার ছিল যথাক্রমে চীন, ভারত, তুরস্ক ও বেলারুশ।
বৈঠকে ট্রাম্প ও রুত্তে একটি চুক্তির বিষয়ও প্রকাশ্যে আনেন। ওই চুক্তি অনুযায়ী ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শত শত কোটি ডলারের অস্ত্র কিনবে। সেই অস্ত্র ইউক্রেনকে দেওয়া হবে। ন্যাটোর প্রধান বলেন, এই চুক্তিটি ‘বিশাল’। ইউক্রেনকে সহায়তার জন্য এই অস্ত্রের ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে জার্মানি, কানাডা, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সুইডেন ও যুক্তরাজ্য।
‘পুতিন ঘাতক নন, কঠিন মানুষ’
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে পুতিনকে ৫০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার পর আজ মঙ্গলবার বিবিসিকে একটি সাক্ষাৎকার দেন ট্রাম্প। সেখানেও রুশ প্রেসিডেন্টের প্রতি নিজের হতাশার কথা জানান তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘তাঁর প্রতি আমি হতাশ। তবে তাঁর সঙ্গে এখনো আমার কাজ বাকি আছে।’ পুতিনকে বিশ্বাস করেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি প্রায় কাউকেই বিশ্বাস করি না।’
পুতিন সম্পর্কে ধারণায় বদল আনতে মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া সহায়তা করেছেন বলে জানান ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমি বাসায় গিয়ে ফার্স্ট লেডিকে বললাম, “তুমি জানো, আজ ভ্লাদিমিরের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমাদের অসাধারণ আলাপ হয়েছে।” আর তারপর ও বলল, “ও তাই? (ইউক্রেনের) আরেকটি শহরে হামলা চালানো হয়েছে।”’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘আমি বলতে চাই না তিনি (পুতিন) একজন ঘাতক। তবে তিনি একজন কঠিন মানুষ।’ এদিকে রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রশংসা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি বলেছেন, এটি ছিল একটি খুব ভালো আলোচনা। ইউক্রেনকে সমর্থন করার এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ।
ট্রাম্পের ‘আলটিমেটাম নাটুকে’
পুতিনকে ট্রাম্পের হুমকির পর আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি মস্কো। রুশ সংবাদমাধ্যমগুলোয় আজ বরং ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর অগ্রগতির খবর প্রচার করা হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ লিখেছেন, ট্রাম্প যে ‘আলটিমেটাম’ দিয়েছেন, তা ‘নাটুকে’।
পুতিনও যে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর আলোচনাকে তেমন আমলে নিচ্ছেন না, তা ক্রেমলিন ঘনিষ্ঠ দুজনের বরাতে সম্প্রতি জানিয়েছিল সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস। ওই সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রুশ প্রেসিডেন্ট নিশ্চিত যে যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ বাহিনীর আধিপত্য বাড়ছে এবং ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ভেঙে পড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়াকে আরও বড় পরিসরে সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। আজ রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভকে এ কথা বলেন তিনি। এদিন বেইজিংয়ে সাংহাই কো–অপারেশন অর্গানাইজেশনের বৈঠকে অংশ নেন লাভরভসহ সদস্যদেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। গত জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই যুদ্ধ থামাতে তৎপর হয়েছেন ট্রাম্প। এ নিয়ে দুই দেশের নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন তিনি। এরপরও যুদ্ধবিরতির একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি মস্কো ও কিয়েভ। বরং বিগত কয়েক মাসে ইউক্রেনজুড়ে ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে রুশ বাহিনী। এরই মধ্যে রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, আজ রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে ভোসক্রেসেনকা ও পেত্রিভকা নামে আরও দুটি গ্রাম দখলে নিয়েছে তারা।
